
সংবাদ আজকাল নিউজ: দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নকাজের ধীরগতি, সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে চরম জনদুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। পর্যটন ও বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে দুইটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হলেও বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ৫ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া আশুগঞ্জ–আখাউড়া স্থলবন্দর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটি শুরু হয়েছে প্রায় ৯ বছর আগে। দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫৭ শতাংশ।
ভারতীয় ঋণে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প ধীরগতির কারণে ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের অন্তত ১১ কিলোমিটার অংশ এখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খানাখন্দে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২১ সালে শুরু হওয়া ঢাকা–সিলেট ছয় লেন প্রকল্পটি শুরু হয়েছে প্রায় ৫ বছর আগে। ১৭ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ২১ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অত্যন্ত ধীর বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রূপসী, তারাব ও বরপা এলাকায় সড়ক বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দে ভরা। এসব স্থানে পণ্যবাহী ট্রাক ও বাস প্রায়ই আটকে গিয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করছে।
একদিকে সংকীর্ণ ও ভাঙাচোরা রাস্তা, অন্যদিকে ধুলাবালিতে পরিবেশ বিপর্যস্ত—দুই মিলিয়ে যাত্রী ও চালকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। অনেক সময় যানজট এতটাই তীব্র হয় যে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা দেন।
যাত্রীরা জানান, ঢাকা থেকে সিলেট যেতে ৮–৯ ঘণ্টা সময় লাগছে এবং ফেরার পথে আরও বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল এলাকায় খোয়াই নদীর সেতুর পাশে চলমান নির্মাণকাজ যানজটের অন্যতম বড় কারণ।
মহাসড়কের দুই লেনের সংকীর্ণতা ও অতিরিক্ত ভারী যানবাহনের কারণে গতি ঘণ্টায় ৫০–৬০ কিলোমিটারের বেশি উঠছে না। ধীরগতির ট্রাকের কারণে সহজে ওভারটেক করা সম্ভব না হওয়ায় যাত্রার সময় আরও দীর্ঘ হচ্ছে এবং শারীরিক-মানসিক চাপ বাড়ছে।
ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের এই বেহাল অবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সিলেটের পর্যটন শিল্পে। হবিগঞ্জের দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, সড়কের দুরবস্থার কারণে উচ্চ ও উচ্চমধ্যবিত্ত পর্যটকরা ব্যক্তিগত গাড়িতে সিলেট ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, অনেক পর্যটক এখন বিমানে সিলেট এসে সেখান থেকে গাড়িতে অন্য গন্তব্যে যাচ্ছেন, ফলে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে এবং ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সিলেট ট্যুরিজম ক্লাবের সভাপতি হুমায়ূন কবীর লিটন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি সড়কের অব্যবস্থাপনাও পর্যটনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের অন্তত ২১টি যানজটপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে কাঞ্চন ব্রিজ এলাকা, গাউছিয়াগামী লেন, রূপসী–বরপা, ভেলানগর, ইটাখোলা, শেরপুর মোড়, আশুগঞ্জ ও বিশ্বরোড গোলচত্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো।
ঢাকা–সিলেট করিডোর উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক এ কে মোহাম্মদ ফজলুল করিম জানান, কিছু এলাকায় বিকল্প সার্ভিস লেন চালু করা হয়েছে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ। আগামী শুষ্ক মৌসুমে কাজের গতি বাড়িয়ে বড় অগ্রগতি অর্জনের আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘ ৫ থেকে ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও দুইটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতার কারণে ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক এখন জনদুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। পর্যটন, ব্যবসা এবং ঈদযাত্রা—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদকের নাম 


















